পদ্মার পানিবৃদ্ধিতে রাজশাহীর পবা ও বাঘা উপজেলার সাতটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠদান বন্ধ রয়েছে। এই দুই উপজেলায় পদ্মার চরে ১২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এরমধ্যে পবার একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অন্য সরকারি প্রাথমিকে পাঠদানের ব্যবস্থা করা হয়েছে। চর একেতো দুর্গম এলাকা, দুইয়ে ঝড়েপড়ার হার বেশি এমন পরিস্থিতে সাত বিদ্যালয়ের প্রায় সাড়ে ৭০০ শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবনে নেমে এসেছে অনিশ্চয়তা। আর বেশ কয়েটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে- জেলা পবার পদ্মা চরে তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে- চরখিদিপুর, চর নবীনগর (মাজারদিয়াড়) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও চর তারানগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। তবে প্রতিবছর নদীর পানিতে সাড়ে তিন থেকে চারফুট পানির নিচে তলিয়ে যায় চরখিদিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এরফলে বছরে দুই থেকে আড়াই মাস বন্ধ থাকে পাঠদান। বাকি দুই চরে পানি উঠেনা। আর উঠলেও শিক্ষার্থীদের পাঠদানে সমস্য হয় না।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বিকেলে সরেজমিনে চরখিদিপুরে গিয়ে দেখা গেছে- পুরো খিদিরপুরের প্রতিটি বাড়িতে পানি ঢুকে গেছে। কোথায় তিল ধরনের জায়গা নেই। বেশির ভাগ বাড়ি তিন থেকে চার ফুট পানির নিচে। একই অবস্থা এলাকার একমাত্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিতে। এই বিদ্যালয়ের সবকটি ক্লাসে পানি ঢুকে গেছে। বিদ্যালয়ে পাঠের কাটাতারের বেড়ার খুটিগুলো ডুব ডুব অবস্থা। এমন পরিস্থিতিতে বাধ্য হয়ে পাঠদান বন্ধ করেছে কর্তৃপক্ষ। এই এলাকার বাসিন্দা ও এই স্কুলের অনেক শিক্ষার্থী ও তাদের অভিবাকরা লোকালয়ে (রাজশাহী শহরে) গিয়েছে। তারা শ্যামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুইটি শ্রেণি কক্ষে ক্লাস করছে বলে জানায় সংশ্লিষ্টরা।
চরখিদিরপুরের বাসিন্দা সাদ্দাম আলীর দুই ছেলে-মেয়ে পড়াশোনা করে চরের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তিনি বলেন-স্কুল পদ্মার পানিতে ঢুকে গেছে। এরফলে স্কুলে শিক্ষকরা আসতে পারে না। আর স্কুলে শিক্ষার্থীদের বসানোর ব্যবস্থা নেই। চারফুট পানির নিচে ডুবেছে স্কুল। পানি নামা নিয়ে এক থেকে দেড় মাস ক্লাস বন্ধ থাকবে। আর ছেলে-মেয়েদের অভিভাকরা লোকালয়ে পাঠিয়েছে। ছোট ছোট ছেলে-মেয়ে পানিতে তাদের ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে।
দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়া সিফাত বলেন- স্কুলে নৌকা নিয়ে যেতে হবে। পানিতে স্কুল ডুবে গেছে। ক্লাস হয় না।
অপরদিকে, পদ্মা নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় বাঘার চরাঞ্চলের নয়টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্লাবিত হয়েছে। এসব বিদ্যালয়ের কয়েকটিতে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। কোনো কোনো বিদ্যালয় আবার বন্যাকবলিত এলাকার লোকজনের আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। বাঘা উপজেলা শিক্ষা অফিসের ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়- পদ্মা নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় চরাঞ্চলে অবস্থিত বিদ্যালয় ও এর আশপাশের এলাকা প্লাবিত হয়েছে। পরিস্থিতি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন- উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা। পরে বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকেও অবহিত করা হয়েছে।
বাঘার নয়টির মধ্যে তিনটি পাঠদান অব্যাহত রয়েছে। এরমেধ্যে পলাশীফতেপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। বিদ্যালয়টি ফ্লাড শেল্টার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। চকরাজাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও পূর্বচকরাজাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েপাঠদান কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। এছাড়া চৌমাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি নদী ভাঙনের কারণে সরানো হয়েছে। বর্তমানে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। আতারপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি বন্যাকবলিত। এলাকার বন্যাদুর্গত লোকজন আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে বিদ্যালয়টি ব্যবহার করছেন। এই স্কুলে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। পশ্চিমচরকালিদাসখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি বন্যাকবলিত হওয়ায় পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। ফতেহপুর পলাশী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি বন্যাকবলিত। এলাকার বন্যাদুর্গত লোকজন আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে এটি ব্যবহার করছেন। ফলে পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। লক্ষ্মীনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্যাকবলিত হওয়ায় পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এছাড়া চরকালিদাসখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি বন্যাকবলিত এবং পাঠদান কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।
চকরাজাপুর ইউনিয়ন পরিষদের ২ নম্বর চৌমাদিয়ায় ওয়ার্ডের সাবেক মেম্বার আবদুর রহমান বলেন, হঠাৎ করে পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। এরফলে স্কুল, মসজিদ ছাড়াও মানুষের বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।
চৌমাদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সোহেল রানা বলেন, বিদ্যালয়ে যাওয়ার কোনো পরিস্থিতি নেই, স্কুল ভেঙে নদীগর্ভে চলে গেছে। তাই পাঠদান বন্ধ রাখা হয়েছে। এ বিদ্যালয়ে ৯১ জন শিক্ষার্থী ও ৩ জন শিক্ষক রয়েছে।
বাঘা উপজেলা শিক্ষা অফিসার মীর মো. মামুনূর রহমান বলেন- পদ্মার পানি বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বাঘার চরাঞ্চলের এসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। পাশাপাশি কয়েকটি বিদ্যালয় বন্যাদুর্গত মানুষের আশ্রয়ের স্থান হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে। গত ৯ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট ক্লাস্টারের উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সরেজমিনে বিদ্যালয়গুলো পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে তিনি বিদ্যালয়গুলোর পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন এবং বিষয়টি বাঘা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে অবহিত করেন।
বিষয়টি নিয়ে পবা উপজেলা শিক্ষা অফিসার জোবায়দা রওশন জাহান বলেন- পবা উপজেলা এলাকায় পদ্মা চরে তিনটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। একটা চরখিদিপুর, চর নবীনগর (মাজার দিয়া) সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও চর তারানগর। নদীতে পানি বৃদ্ধিতে চরখিদিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের শ্যামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদান চলানো হচ্ছেছে। এটা জেলা অফিসে জানানো হয়েছে
এ বিষয়ে রাজশাহী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার এ.কে.এম আনোয়ার হোসেন বলেন- স্কুলগুলোতে পাঠদান বন্ধ নেই। যেগুলো বন্ধ রয়েছে, সেগুলো বিকল্পভাবে পাঠদান করানো হচ্ছে।
রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের চরখিদিরপুরে ইউপি সদস্য শহিদুল ইসলাম বলেন, ২০০ পরিবারের প্রায় ৭০০ মানুষ পানিবন্দি হয়েছে। মানুষ চর ছাড়ছে। এলাকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি বন্ধ রয়েছে। স্কুলের চারপাশে অধৈয় পানি। বিদ্যালয়ের আশে পাশে তিন থেকে চারফুট পানি।

রিপোর্টারের নাম 

























