জীবনসঙ্গী মানুষের জীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেয়ামত। একজন নেক স্বামী বা নেক স্ত্রী শুধু পার্থিব জীবনের সুখ-শান্তির কারণই নন, বরং দ্বীন পালন, চরিত্র রক্ষা এবং আখিরাতের সফলতারও গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক।
তাই একজন নির্দিষ্ট মানুষকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেতে চাওয়া মানুষের স্বাভাবিক অনুভূতি। আর ইসলামে কোনো হালাল ও বৈধ বিষয় আল্লাহর কাছে চাওয়ায় নিষেধ নেই। তবে সেই দোয়া হতে হবে শরিয়তের সীমার মধ্যে, আল্লাহর ফয়সালার প্রতি সন্তুষ্ট থেকে এবং নিজের কল্যাণকে প্রাধান্য দিয়ে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমাদের প্রতিপালক বলেন, ‘তোমরা আমার কাছে দোয়া করো, আমি তোমাদের দোয়া কবুল করব।
’ (সুরা : গাফির, আয়াত : ৬০)
আল্লাহ তাআলা আরো বলেন, ‘যখন আমার বান্দারা আমার সম্পর্কে আপনাকে জিজ্ঞাসা করে, তখন বলে দিন, আমি তো নিকটেই আছি। দোয়াকারী যখন আমাকে ডাকে, আমি তার ডাকে সাড়া দিই।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ১৮৬)
এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে যে, বৈধ কোনো চাওয়া আল্লাহর কাছে পেশ করা সম্পূর্ণ বৈধ। তাই কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পাওয়ার জন্যও দোয়া করা জায়েজ।
তবে এক্ষেত্রে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শর্ত রয়েছে। সেগুলো হলো—
১. সম্পর্কটি অবশ্যই হালাল হতে হবে
বিয়ের আগে অবৈধ প্রেম, গোপন সম্পর্ক বা অনৈতিক যোগাযোগ ইসলামে বৈধ নয়। তাই কাউকে পছন্দ করলেও তার সঙ্গে হারাম সম্পর্কে জড়িয়ে না পড়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করা উচিত। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘তোমরা অশ্লীলতার নিকটেও যেও না। নিশ্চয়ই তা অত্যন্ত নিকৃষ্ট কাজ ও মন্দ পথ।
’ (সুরা : ইসরা, আয়াত : ৩২)
২. নিজের পছন্দের চেয়ে আল্লাহর ফয়সালাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে
মানুষ সীমিত জ্ঞান দিয়ে সিদ্ধান্ত নেয়, কিন্তু আল্লাহ সর্বজ্ঞ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হতে পারে তোমরা কোনো কিছু অপছন্দ করছ, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আবার হতে পারে তোমরা কোনো কিছু ভালোবাস, অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।’ (সুরা : বাকারা, আয়াত : ২১৬)
তাই দোয়ার সময় এভাবে বলা উত্তম, ‘হে আল্লাহ! অমুক ব্যক্তি যদি আমার দ্বীন, দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য কল্যাণকর হন, তবে তাকে আমার জীবনসঙ্গী হিসেবে নির্ধারণ করুন। আর যদি এতে অকল্যাণ থাকে, তবে আমাকে উত্তম বিকল্প দান করুন এবং আপনার ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকার তাওফিক দিন।’
৩. ইস্তিখারা—সঠিক সিদ্ধান্তে লাভে সুন্নতি পদ্ধতি
কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের আগে রাসুলুল্লাহ (সা.) ইস্তিখারা করতে শিক্ষা দিয়েছেন। জাবির (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের কোরআনের সুরা শেখানোর মতো গুরুত্ব দিয়ে সব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ইস্তিখারা শিক্ষা দিতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস : ১১৬৬)
তাই বিয়ের বিষয়ে অগ্রসর হওয়ার আগে দুই রাকাত সালাতুল ইস্তিখারা আদায় করা সুন্নত।
বিয়ের ক্ষেত্রে যে দুই দোয়া বেশি বেশি পড়বেন
১. নেক জীবনসঙ্গী ও সন্তানের জন্য সর্বোত্তম দোয়া
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا
উচ্চারণ : রাব্বানা হাব লানা মিন আযওয়াজিনা ওয়া যুররিয়্যাতিনা কুররাতা আ’ইউনিন ওয়াজআলনা লিল মুত্তাকিনা ইমামা।
অর্থ : ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের স্ত্রী/স্বামী ও সন্তানদের আমাদের চোখের শীতলতা বানিয়ে দিন এবং আমাদের মুত্তাকিদের জন্য আদর্শ বানান।’ (সুরা : ফুরকান, আয়াত : ৭৪)
২. মুসা (আ.)-এর দোয়া
মাদইয়ানে একাকী অবস্থায় হযরত মুসা (আ.) এই দোয়া করেছিলেন। এরপর আল্লাহ তাঁর আশ্রয়, কর্মসংস্থান এবং বিবাহের ব্যবস্থা করে দেন।
رَبِّ إِنِّي لِمَا أَنْزَلْتَ إِلَيَّ مِنْ خَيْرٍ فَقِيرٌ
উচ্চারণ : রাব্বি ইন্নী লিমা আনযালতা ইলাইয়া মিন খাইরিন ফাকীর।
অর্থ : ‘হে আমার প্রতিপালক! আপনি আমার প্রতি যে কল্যাণই নাজিল করবেন, আমি তারই মুখাপেক্ষী।’ (সুরা : কাসাস, আয়াত : ২৪)
কাউকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পাওয়ার জন্য আল্লাহর কাছে দোয়া করা সম্পূর্ণ বৈধ। বরং একজন মুমিনের উচিত নিজের হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষা একমাত্র আল্লাহর কাছেই প্রকাশ করা। তবে সেই দোয়ার সঙ্গে থাকতে হবে তাকওয়া, ধৈর্য, ইস্তিখারা, বৈধ প্রচেষ্টা এবং আল্লাহর সিদ্ধান্তের প্রতি পূর্ণ আস্থা। কারণ আমাদের দৃষ্টি সীমিত, কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান অসীম। তিনি জানেন কে আমাদের দ্বীন, দুনিয়া ও আখিরাতের জন্য সর্বাধিক কল্যাণকর।
অতএব, আমরা যেন শুধু নিজের ইচ্ছা পূরণের জন্য নয়, বরং নেক, দ্বীনদার, চরিত্রবান ও চোখের শীতলতাদানকারী জীবনসঙ্গী লাভের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি। আর যদি আমাদের পছন্দের মানুষই আমাদের জন্য কল্যাণকর হন, তবে আল্লাহ যেন তাঁর সঙ্গে হালাল ও বরকতময় বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পথ সহজ করে দেন। আর যদি তাতে কল্যাণ না থাকে, তবে আল্লাহ যেন আমাদের জন্য তার চেয়েও উত্তম ফয়সালা নির্ধারণ করেন এবং সেই ফয়সালার ওপর সন্তুষ্ট থাকার তাওফিক দান করেন। আমিন।

ডেইলি দেশ নিউজ ডটকম ডেস্ক 






















