বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

জুলাই গণঅভ্যুত্থান: গোলাপগঞ্জের ৭ শহীদ পরিবারে আজও থামেনি কান্না

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হলেও সিলেটের গোলাপগঞ্জে আন্দোলনে নিহত সাত শহীদের পরিবারের অপেক্ষার অবসান হয়নি। স্বজন হারানোর শোকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিচার না পাওয়ার হতাশা। মামলার তদন্ত চলমান থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো মামলায় অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল না হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন নিহতদের পরিবারের সদস্যরা।

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে সারাদেশের মতো গোলাপগঞ্জেও ছাত্র-জনতার আন্দোলন শুরু হয়। সকালে ঢাকাদক্ষিণ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে উপজেলার ঢাকাদক্ষিণ ইউনিয়নের বারকোট এলাকায় গুলিতে চারজন আন্দোলনকারী নিহত হন। একই দিন পৌর শহরের কদমতলী এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান আরো দুজন। এছাড়া ৫ আগস্ট সিলেট নগরের ক্বিন ব্রিজ এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান গোলাপগঞ্জের আরো এক বাসিন্দা। এসব ঘটনায় শতাধিক আন্দোলনকারী আহত হন।

নিহত সাতজন হলেন- উপজেলার নিশ্চিন্ত গ্রামের নাজমুল ইসলাম, আমুড়া ইউনিয়নের শিলঘাট গ্রামের সানি আহমদ, ঢাকাদক্ষিণ ইউনিয়নের বারকোট গ্রামের তাজ উদ্দীন, একই ইউনিয়নের দত্তরাইল গ্রামের মিনহাজ উদ্দিন, ঘোষগাঁও গ্রামের গৌছ উদ্দিন, রায়গড় গ্রামের জয় আহমদ এবং কানিশাইল গ্রামের কামরুল ইসলাম পাভেল।

দুই বছর পরও প্রিয়জনদের হারানোর ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন পরিবারের সদস্যরা। তারা বলছেন, সময় পেরিয়েছে, কিন্তু ন্যায়বিচারের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি তারা দেখছেন না।

শহীদ গৌছ উদ্দিনের ভাই আবুল কালাম বলেন, “আমার ভাইকে আর কোনোদিন ফিরে পাব না। কিন্তু যারা এই হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন এবং যারা আহত হয়েছেন, তাদের জন্য সুষ্ঠু বিচার চাই। দুই বছর হয়ে গেলেও আমরা এখনো সেই বিচার পাইনি।”

শহীদ কামরুল ইসলাম পাভেলের বাবা রফিক উদ্দিন বলেন, “ছেলেকে হারানোর বেদনা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি দেখছি না। প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হোক। আমরা চাই, ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আর কোনো পরিবারকে এমন দিন দেখতে না হোক।”

শহীদ নাজমুল ইসলামের ভাই ছামিদ আহমেদ অভিযোগ করে বলেন, “তৎকালীন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অভিজিৎ চৌধুরীর নির্দেশে বিজিবির গুলিতে আমার ভাই নিহত হন। সাধারণ মানুষের হাতে তার মৃত্যু হয়নি। ঘটনার সময় বিজিবি, পুলিশ ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু পরে পরিবারের সঙ্গে আলোচনা না করেই প্রায় ৩০০ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। আমাদের মতে, ওই মামলার অনেক আসামিই নির্দোষ।”

এ বিষয়ে গোলাপগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ছবেদ আলী বলেন, জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গোলাপগঞ্জ থানায় দুটি, সিআইডিতে তিনটি এবং পিবিআইতে দুটি হত্যা মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্তের কাজ অনেক দূর এগিয়েছে। তবে এখনো কোনো মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়নি।

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

জুলাই গণঅভ্যুত্থান: গোলাপগঞ্জের ৭ শহীদ পরিবারে আজও থামেনি কান্না

প্রকাশিত সময় : ১০:১৬:১৫ অপরাহ্ন, বুধবার, ৫ অগাস্ট ২০২৬

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দুই বছর পূর্ণ হলেও সিলেটের গোলাপগঞ্জে আন্দোলনে নিহত সাত শহীদের পরিবারের অপেক্ষার অবসান হয়নি। স্বজন হারানোর শোকের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিচার না পাওয়ার হতাশা। মামলার তদন্ত চলমান থাকলেও এখন পর্যন্ত কোনো মামলায় অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল না হওয়ায় ক্ষোভ ও হতাশা প্রকাশ করেছেন নিহতদের পরিবারের সদস্যরা।

২০২৪ সালের ৪ আগস্ট শেখ হাসিনার সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবিতে সারাদেশের মতো গোলাপগঞ্জেও ছাত্র-জনতার আন্দোলন শুরু হয়। সকালে ঢাকাদক্ষিণ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে উপজেলার ঢাকাদক্ষিণ ইউনিয়নের বারকোট এলাকায় গুলিতে চারজন আন্দোলনকারী নিহত হন। একই দিন পৌর শহরের কদমতলী এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে প্রাণ হারান আরো দুজন। এছাড়া ৫ আগস্ট সিলেট নগরের ক্বিন ব্রিজ এলাকায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান গোলাপগঞ্জের আরো এক বাসিন্দা। এসব ঘটনায় শতাধিক আন্দোলনকারী আহত হন।

নিহত সাতজন হলেন- উপজেলার নিশ্চিন্ত গ্রামের নাজমুল ইসলাম, আমুড়া ইউনিয়নের শিলঘাট গ্রামের সানি আহমদ, ঢাকাদক্ষিণ ইউনিয়নের বারকোট গ্রামের তাজ উদ্দীন, একই ইউনিয়নের দত্তরাইল গ্রামের মিনহাজ উদ্দিন, ঘোষগাঁও গ্রামের গৌছ উদ্দিন, রায়গড় গ্রামের জয় আহমদ এবং কানিশাইল গ্রামের কামরুল ইসলাম পাভেল।

দুই বছর পরও প্রিয়জনদের হারানোর ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছেন পরিবারের সদস্যরা। তারা বলছেন, সময় পেরিয়েছে, কিন্তু ন্যায়বিচারের কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি তারা দেখছেন না।

শহীদ গৌছ উদ্দিনের ভাই আবুল কালাম বলেন, “আমার ভাইকে আর কোনোদিন ফিরে পাব না। কিন্তু যারা এই হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন এবং যারা আহত হয়েছেন, তাদের জন্য সুষ্ঠু বিচার চাই। দুই বছর হয়ে গেলেও আমরা এখনো সেই বিচার পাইনি।”

শহীদ কামরুল ইসলাম পাভেলের বাবা রফিক উদ্দিন বলেন, “ছেলেকে হারানোর বেদনা ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। দুই বছর পেরিয়ে গেলেও মামলার উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি দেখছি না। প্রকৃত দায়ীদের চিহ্নিত করে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করা হোক। আমরা চাই, ভবিষ্যতে বাংলাদেশে আর কোনো পরিবারকে এমন দিন দেখতে না হোক।”

শহীদ নাজমুল ইসলামের ভাই ছামিদ আহমেদ অভিযোগ করে বলেন, “তৎকালীন উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) অভিজিৎ চৌধুরীর নির্দেশে বিজিবির গুলিতে আমার ভাই নিহত হন। সাধারণ মানুষের হাতে তার মৃত্যু হয়নি। ঘটনার সময় বিজিবি, পুলিশ ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু পরে পরিবারের সঙ্গে আলোচনা না করেই প্রায় ৩০০ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়েছে। আমাদের মতে, ওই মামলার অনেক আসামিই নির্দোষ।”

এ বিষয়ে গোলাপগঞ্জ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ছবেদ আলী বলেন, জুলাই আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গোলাপগঞ্জ থানায় দুটি, সিআইডিতে তিনটি এবং পিবিআইতে দুটি হত্যা মামলা তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্তের কাজ অনেক দূর এগিয়েছে। তবে এখনো কোনো মামলার অভিযোগপত্র আদালতে জমা দেওয়া হয়নি।