শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬, ৬ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

প্রধান শিক্ষিকাকে ২৭ বার ছুরিকাঘাতে হত্যা: ‘বাবু’ শব্দেই মিলল আসামিদের সূত্র

ভারতের তেলেঙ্গানার নালগোন্ডা জেলার কন্ডামল্লেপল্লীতে একটি বেসরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ও পরিচালক ক্যাল্লু রূপা রেড্ডিকে (৪৮) নৃশংসভাবে হত্যার রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। অর্থ এবং বিলাসী জীবনযাপনের লোভে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয় বলে জানা গেছে। ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে দশম শ্রেণির দুই শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির পুলিশ।

গত ১২ আগস্ট সকালে নিজ বাড়ি থেকে নগরজুনা পাবলিক স্কুলের প্রধান রূপা রেড্ডির ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তাঁর শরীরে মোট ২৭টি ছুরিকাঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। ঘটনার সময় তাঁর স্বামী পেশাগত কাজে হায়দরাবাদে ছিলেন। স্ত্রীকে মুঠোফোনে না পেয়ে প্রতিবেশীদের খবর দিলে তাঁরা এসে রূপা রেড্ডির রক্তাক্ত মরদেহ দেখতে পান এবং পুলিশে খবর দেন।

চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে পুলিশ পাঁচটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করে। সিসিটিভি ফুটেজ, ফরেনসিক আলামত, আঙুলের ছাপ ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট বিশ্লেষণের পাশাপাশি ৮০ জনেরও বেশি মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন তদন্তকারীরা।

একটি শব্দেই রহস্যের জট খোলে

তদন্তে সবচেয়ে বড় মোড় আসে রূপা রেড্ডির শেষ কল রেকর্ড থেকে। মুঠোফোনটি বন্ধ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে এক আত্মীয়ের সঙ্গে কথা বলছিলেন তিনি। সেই কথোপকথনের শেষ মুহূর্তে তাঁর মুখ থেকে একটি শব্দ বের হয়েছিল-‘বাবু’।

নালগোন্ডার সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা শরৎ চন্দ্র পাওয়ার সাংবাদিকদের জানান, ওই ‘বাবু’ শব্দটি কাকে উদ্দেশ্য করে বলা হতে পারে, তা অনুসন্ধানে নামতেই স্কুলের শিক্ষার্থীদের বিষয়টি সামনে আসে। কারণ রূপা রেড্ডি স্নেহের ছলে শিক্ষার্থীদের প্রায়ই ‘বাবু’ বলে ডাকতেন।

এরপরই সন্দেহভাজন শিক্ষার্থীদের তালিকা তৈরি করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে পুলিশ। তদন্তে দেখা যায়, ঘটনার পর থেকে দশম শ্রেণির পাঁচজন ছাত্র স্কুলে অনুপস্থিত রয়েছে। পরে ওই পাঁচজনের ওপর নজরদারি চালিয়ে দেখা যায়, দুই শিক্ষার্থী হঠাৎ করেই অঢেল অর্থ খরচ করছে এবং বন্ধুদের নিয়ে পার্টি করছে। গত বুধবার (১৯ আগস্ট) তাদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে পুরো ঘটনার সত্যতা বেরিয়ে আসে।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ঘটনার পেছনে পুরোনো ক্ষোভও কাজ করেছে। কিছুদিন আগে হোস্টেলে থাকা অবস্থায় ওই শিক্ষার্থীদের ব্যাগ থেকে নগদ টাকা ও মুঠোফোন পাওয়ার পর তাদের ভর্ৎসনা করেন রূপা রেড্ডি। বিষয়টি অভিভাবকদের জানানোর পর তাদের হোস্টেল থেকে বের করে ডে-স্কলার করে দেওয়া হয়। এতে তারা শিক্ষিকার ওপর চরম ক্ষুব্ধ ছিল।

পরবর্তীতে টাকা চুরি এবং প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রায় পাঁচ দিন ধরে শিক্ষিকার বাড়িতে নজরদারি চালায় তারা। পরিচয় গোপন রাখতে বাজার থেকে গ্লাভস ও মাঙ্কি ক্যাপ কিনে পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটনার দিন এক শিক্ষার্থী বাড়িতে ঢোকে। সে ঘরের ভেতর রাখা আড়াই লাখ টাকা চুরি করে পালানোর চেষ্টা করার সময় আকস্মিকভাবে তার মাথার মাঙ্কি ক্যাপটি খুলে যায়। রূপা রেড্ডি তাকে চিনে ফেলায় পরিচয় গোপন রাখতে ধারালো ছুরি দিয়ে তাকে ২৭ বার আঘাত করে হত্যা করে সে।

হত্যাকাণ্ডের পর রক্তমাখা পোশাক ও টুপি মাটির নিচে পুঁতে রেখে চুরি করা টাকা নিয়ে গোয়ায় ঘুরতে চলে যায় অভিযুক্ত দুই শিক্ষার্থী। পুলিশ জানায়, আসামিদের কাছ থেকে ১ লাখ ৫৪ হাজার নগদ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে, যার বেশ কয়েকটি নোটে রক্তের দাগ ছিল। এ ছাড়া চুরির টাকা দিয়ে কেনা একটি নতুন আইফোন ও নিহত শিক্ষিকার মুঠোফোনটি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

নিরাপত্তা ও আইনি প্রক্রিয়ার স্বার্থে গ্রেপ্তার দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক আসামিকে শিশু সংশোধনাগারে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন।

সূত্র: এনডিটিভি

Tag :

Write Your Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Save Your Email and Others Information

এ বছর হচ্ছে না বিপিএল, নতুন পরিকল্পনার কথা জানালেন তামিম

প্রধান শিক্ষিকাকে ২৭ বার ছুরিকাঘাতে হত্যা: ‘বাবু’ শব্দেই মিলল আসামিদের সূত্র

প্রকাশিত সময় : ১০:৩১:২৩ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ২১ অগাস্ট ২০২৬
ভারতের তেলেঙ্গানার নালগোন্ডা জেলার কন্ডামল্লেপল্লীতে একটি বেসরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ও পরিচালক ক্যাল্লু রূপা রেড্ডিকে (৪৮) নৃশংসভাবে হত্যার রহস্য উদঘাটন করেছে পুলিশ। অর্থ এবং বিলাসী জীবনযাপনের লোভে এই হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয় বলে জানা গেছে। ঘটনায় জড়িত থাকার অভিযোগে দশম শ্রেণির দুই শিক্ষার্থীকে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির পুলিশ।

গত ১২ আগস্ট সকালে নিজ বাড়ি থেকে নগরজুনা পাবলিক স্কুলের প্রধান রূপা রেড্ডির ক্ষতবিক্ষত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তাঁর শরীরে মোট ২৭টি ছুরিকাঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। ঘটনার সময় তাঁর স্বামী পেশাগত কাজে হায়দরাবাদে ছিলেন। স্ত্রীকে মুঠোফোনে না পেয়ে প্রতিবেশীদের খবর দিলে তাঁরা এসে রূপা রেড্ডির রক্তাক্ত মরদেহ দেখতে পান এবং পুলিশে খবর দেন।

চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটনে পুলিশ পাঁচটি বিশেষ তদন্ত দল গঠন করে। সিসিটিভি ফুটেজ, ফরেনসিক আলামত, আঙুলের ছাপ ও ফিঙ্গারপ্রিন্ট বিশ্লেষণের পাশাপাশি ৮০ জনেরও বেশি মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন তদন্তকারীরা।

একটি শব্দেই রহস্যের জট খোলে

তদন্তে সবচেয়ে বড় মোড় আসে রূপা রেড্ডির শেষ কল রেকর্ড থেকে। মুঠোফোনটি বন্ধ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে এক আত্মীয়ের সঙ্গে কথা বলছিলেন তিনি। সেই কথোপকথনের শেষ মুহূর্তে তাঁর মুখ থেকে একটি শব্দ বের হয়েছিল-‘বাবু’।

নালগোন্ডার সিনিয়র পুলিশ কর্মকর্তা শরৎ চন্দ্র পাওয়ার সাংবাদিকদের জানান, ওই ‘বাবু’ শব্দটি কাকে উদ্দেশ্য করে বলা হতে পারে, তা অনুসন্ধানে নামতেই স্কুলের শিক্ষার্থীদের বিষয়টি সামনে আসে। কারণ রূপা রেড্ডি স্নেহের ছলে শিক্ষার্থীদের প্রায়ই ‘বাবু’ বলে ডাকতেন।

এরপরই সন্দেহভাজন শিক্ষার্থীদের তালিকা তৈরি করে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে পুলিশ। তদন্তে দেখা যায়, ঘটনার পর থেকে দশম শ্রেণির পাঁচজন ছাত্র স্কুলে অনুপস্থিত রয়েছে। পরে ওই পাঁচজনের ওপর নজরদারি চালিয়ে দেখা যায়, দুই শিক্ষার্থী হঠাৎ করেই অঢেল অর্থ খরচ করছে এবং বন্ধুদের নিয়ে পার্টি করছে। গত বুধবার (১৯ আগস্ট) তাদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে পুরো ঘটনার সত্যতা বেরিয়ে আসে।

পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, ঘটনার পেছনে পুরোনো ক্ষোভও কাজ করেছে। কিছুদিন আগে হোস্টেলে থাকা অবস্থায় ওই শিক্ষার্থীদের ব্যাগ থেকে নগদ টাকা ও মুঠোফোন পাওয়ার পর তাদের ভর্ৎসনা করেন রূপা রেড্ডি। বিষয়টি অভিভাবকদের জানানোর পর তাদের হোস্টেল থেকে বের করে ডে-স্কলার করে দেওয়া হয়। এতে তারা শিক্ষিকার ওপর চরম ক্ষুব্ধ ছিল।

পরবর্তীতে টাকা চুরি এবং প্রতিশোধ নেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রায় পাঁচ দিন ধরে শিক্ষিকার বাড়িতে নজরদারি চালায় তারা। পরিচয় গোপন রাখতে বাজার থেকে গ্লাভস ও মাঙ্কি ক্যাপ কিনে পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটনার দিন এক শিক্ষার্থী বাড়িতে ঢোকে। সে ঘরের ভেতর রাখা আড়াই লাখ টাকা চুরি করে পালানোর চেষ্টা করার সময় আকস্মিকভাবে তার মাথার মাঙ্কি ক্যাপটি খুলে যায়। রূপা রেড্ডি তাকে চিনে ফেলায় পরিচয় গোপন রাখতে ধারালো ছুরি দিয়ে তাকে ২৭ বার আঘাত করে হত্যা করে সে।

হত্যাকাণ্ডের পর রক্তমাখা পোশাক ও টুপি মাটির নিচে পুঁতে রেখে চুরি করা টাকা নিয়ে গোয়ায় ঘুরতে চলে যায় অভিযুক্ত দুই শিক্ষার্থী। পুলিশ জানায়, আসামিদের কাছ থেকে ১ লাখ ৫৪ হাজার নগদ টাকা উদ্ধার করা হয়েছে, যার বেশ কয়েকটি নোটে রক্তের দাগ ছিল। এ ছাড়া চুরির টাকা দিয়ে কেনা একটি নতুন আইফোন ও নিহত শিক্ষিকার মুঠোফোনটি বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে।

নিরাপত্তা ও আইনি প্রক্রিয়ার স্বার্থে গ্রেপ্তার দুই অপ্রাপ্তবয়স্ক আসামিকে শিশু সংশোধনাগারে পাঠানোর প্রস্তুতি চলছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন।

সূত্র: এনডিটিভি